Top News

রাশিয়া ও ইরান-সংক্রান্ত গোষ্ঠীগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে ড্রোন ক্রয়ে জড়িত: চেইনঅ্যানালাইসিস

 

ক্রিপ্টোকারন্সির প্রতীকী ছবিরয়টার্স

রয়টার্স : রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠী সামরিক এবং আধা-সামরিক ড্রোন ও ড্রোন তৈরির সরঞ্জাম কিনতে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘চেইনঅ্যানালাইসিস’-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার মূলত স্বল্প মূল্যের সামরিক ড্রোন সংগ্রহের ক্ষেত্রে কেন্দ্রিত। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে লেনদেনের গোপনীয়তা রক্ষা করা, এবং প্রথাগত ব্যাংকিং সিস্টেমে শনাক্তকরণের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

বর্তমান সময়ে ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য ড্রোনের ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে এই ধরনের ড্রোন সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। সহজলভ্যতা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করার মাধ্যমে গোপনীয়তা রক্ষা করা, এই দুই কারণে কর্তৃপক্ষের জন্য কারা এই ড্রোনগুলো কিনছে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে, তা শনাক্ত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

চেইনঅ্যানালাইসিস জানিয়েছে, বর্তমানে ড্রোন কেনার বেশির ভাগ লেনদেন এখনও প্রথাগত আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে হচ্ছে। তবু ক্রমেই এই নেটওয়ার্কগুলো ব্লকচেইনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ব্লকচেইনের মূল সুবিধা হলো, এটি লেনদেনের উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম। ফলে তদন্তকারীরা লেনদেনের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করতে পারে, যা প্রথাগত পদ্ধতিতে সম্ভব নয়।

গবেষকরা দেখেছেন, ড্রোন নির্মাতা বা আধা-সামরিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগত ক্রিপ্টো ওয়ালেট থেকে অর্থের লেনদেন ট্র্যাক করা সম্ভব। বিশেষভাবে তারা লক্ষ্য করেছেন, কীভাবে ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে স্বল্প মূল্যের ড্রোন এবং ড্রোন তৈরির সরঞ্জাম ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ক্রয় করা হচ্ছে।

চেইনঅ্যানালাইসিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর রুশপন্থী গোষ্ঠীগুলো ৮৩ লাখ ডলারের বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি অনুদান হিসেবে সংগ্রহ করেছে। সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ সরাসরি ড্রোন কেনার জন্য ব্যয় হয়েছে। চেইনঅ্যানালাইসিসের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান অ্যান্ড্রু ফিয়ারম্যান বলেন, “একবার বিক্রেতাকে শনাক্ত করা গেলেই, লেনদেনের অপর পক্ষকে চিহ্নিত করা এবং তাদের উদ্দেশ্য যাচাই করা সহজ হয়। এতে কেনাকাটার প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, লেনদেনের মাধ্যমেই গোপন যোগাযোগ ও সরঞ্জাম সংগ্রহের চক্রকে চিহ্নিত করা সম্ভব।”

ফিয়ারম্যান আরও বলেছেন, তারা ২,২০০ থেকে ৩,৫০০ ডলারের ক্রিপ্টো লেনদেনের সঙ্গে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে থাকা ড্রোন এবং সরঞ্জামের মূল্যের সঠিক মিল খুঁজে পেয়েছেন। তারা লেনদেনের অনুরোধ, পণ্যের দাম, পণ্য প্রাপ্তির ছবি এবং সরবরাহ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ মনিটর করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় ক্রিপ্টো ওয়ালেট এবং সরবরাহকারীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ইরান-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে ড্রোনের যন্ত্রাংশ কেনা এবং সামরিক সরঞ্জাম বিক্রিতে সক্রিয়। বিশেষভাবে ইসলামিক রেভোলিউশনরি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত একটি ক্রিপ্টো ওয়ালেটের উল্লেখ রয়েছে, যা হংকংভিত্তিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে ড্রোনের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করেছে।

যদিও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ড্রোন কেনার মোট লেনদেন সামরিক খাতের সামগ্রিক কেনাকাটার তুলনায় এখনও কম, তবে ব্লকচেইন প্রযুক্তি প্রথাগত আর্থিক ব্যবস্থায় অদৃশ্য থাকা লেনদেন শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফিয়ারম্যান বলেন, “ব্লকচেইন এমন তথ্য সরবরাহ করে, যা প্রথাগত ব্যাংকিং বা আর্থিক নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। এটি তদন্তকারীদের জন্য নতুন এক দিক উন্মুক্ত করে, যা দিয়ে লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও উৎস বোঝা সম্ভব।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি কেবল ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে নয়, সমসাময়িক যুদ্ধক্ষেত্রে সরঞ্জাম ক্রয় এবং লেনদেনের একটি গোপন মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার যত বাড়বে, ততই এমন লেনদেনের সঠিক পর্যবেক্ষণ আরও জটিল হয়ে উঠবে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি থাকলেও, বাস্তব সময়ে ক্রিপ্টো লেনদেনের উৎস ও গন্তব্য সনাক্ত করা এবং তাদের উদ্দেশ্য যাচাই করা একটি কঠিন প্রক্রিয়া।

ফিয়ারম্যান এও উল্লেখ করেছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের মাধ্যমে সামরিক সরঞ্জামের ক্রয় একটি নতুন ট্রেন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এটি স্বাধীন গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত বাহিনীর জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়, দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে লেনদেন করার সুযোগ দেয়। তবে একই সঙ্গে, এটি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং গোয়েন্দা বিভাগগুলোর জন্য জটিলতা সৃষ্টি করছে, কারণ ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেনকে সম্পূর্ণরূপে গোপন রাখা যায় এবং এটি সহজে অন্য রাষ্ট্র বা সংস্থার নজর এড়াতে পারে।

এই প্রতিবেদনের আলোকে বোঝা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি শুধুমাত্র বিনিয়োগ বা ট্রেডের মাধ্যম নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং লেনদেনের জন্য একটি শক্তিশালী টুল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এ ধরনের লেনদেনের মাত্রা যত বাড়বে, ততই ডিজিটাল কৌশল ব্যবহার করে সমসাময়িক সন্ত্রাসী বা আধা-সামরিক গোষ্ঠী নিজেদের কার্যক্রম চালাতে পারবে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।



Post a Comment

Previous Post Next Post